ইঞ্জিন সংকটে টানা ১১ দিন বন্ধ পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল

অনেকদিন ধরেই লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) সংকটে ভুগছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। সীমিতসংখ্যক ইঞ্জিন দিয়ে যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনা করে আসছে সংস্থাটি। বিদায়ী বছরের ডিসেম্বরে টানা ১১ দিন যাত্রীবাহী ট্রেনের অতিরিক্ত চাহিদা মেটাতে পণ্যবাহী ট্রেনের জন্য কোনো ইঞ্জিন বরাদ্দ রাখা হয়নি।

অনেকদিন ধরেই লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) সংকটে ভুগছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। সীমিতসংখ্যক ইঞ্জিন দিয়ে যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনা করে আসছে সংস্থাটি। বিদায়ী বছরের ডিসেম্বরে টানা ১১ দিন যাত্রীবাহী ট্রেনের অতিরিক্ত চাহিদা মেটাতে পণ্যবাহী ট্রেনের জন্য কোনো ইঞ্জিন বরাদ্দ রাখা হয়নি। এতে গত ১৯-২৯ ডিসেম্বর পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়। এর আগে এত লম্বা সময় পণ্যবাহী ট্রেন বন্ধ রাখার নজির নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

রেলওয়েসংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে প্রতিদিন যাত্রী চাহিদার বিপরীতে ট্রেনের টিকিটের প্রাপ্যতা অন্তত ১০ গুণ কম। উৎসবের সময়গুলোতে বাড়তি ট্রেন ও কোচ সংযোজন করে পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেয়া হয়। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বার্ষিক ছুটির আমেজে ডিসেম্বরে ট্রেনের চাহিদা বাড়লেও রেলওয়ের বাড়তি কোনো আয়োজন থাকে না। ফলে এ সময়টিতে বাড়তি চাহিদা মেটাতে পণ্যবাহী ট্রেন সার্ভিসের ওপর ভর করে পরিস্থিতি সামাল দেয় রেলওয়ে।

রেলওয়ের তথ্যমতে, দুয়েকটি ছাড়া প্রায় সব যাত্রীবাহী ট্রেনই প্রতি বছর লোকসানে চলাচল করে। তবে ব্যতিক্রম পণ্যবাহী ট্রেন সার্ভিস। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের সবচেয়ে বেশি আয়কারী বিরতিহীন ট্রেনের তুলনায় একই রুটের কনটেইনার কিংবা অন্য পণ্যবাহী ট্রেনগুলো দ্বিগুণ আয় করে। তাছাড়া সড়কপথে যানজট, চলন্ত অবস্থায় পণ্য চুরি বা দুর্ঘটনা ঝুঁকির বিপরীতে পণ্য পরিবহনে রেলের প্রতি আগ্রহ ব্যবসায়ীদের। এ খাতে ব্যবসায়ীদের চাহিদা তুঙ্গে থাকলেও রেলওয়ে প্রায়ই অবহেলা দেখিয়ে আসছে। যার সর্বশেষ নজির এ টানা ১১ দিন পণ্যবাহী ট্রেন বন্ধ রাখা। ফলস্বরূপ চট্টগ্রাম বন্দরগামী ও বন্দরে আসা কনটেইনারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানি পরিবহন সংকটের মধ্যে পড়ে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, স্বাভাবিক সময়ে প্রতি মাসে রেলপথে কনটেইনার ট্রেন চলাচল করে উভয়মুখে প্রায় ২০০টি। তবে ডিসেম্বরে চলাচল করেছে মাত্র ৭৪টি। জ্বালানিবাহী ট্রেন চলে মাত্র সাতটি।

চট্টগ্রাম বাদে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে গার্মেন্টস পণ্য ব্যবসায়ীরা আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে কমলাপুর আইসিডি ব্যবহার করায় রেলপথই তাদের জন্য সবচেয়ে লাভজনক। কিন্তু ডিসেম্বরে সারা দেশে যাত্রীবাহী ট্রেনের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বেশ কয়েকটি স্পেশাল ট্রেন সার্ভিস পরিচালনা ও লোকোমোটিভ ফেইলিউরের কারণে সেবা বিঘ্নিত হওয়ায় পণ্য খাতের লোকোমোটিভগুলো সরিয়ে নেয় পরিবহন বিভাগ। এতে করে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা ব্যতীত এবারই প্রথমবারের মতো টানা ১১টি পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল করেনি। এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দর ও বন্দরের বাইরে সিজিপিওয়াই ইয়ার্ডে তৈরি হয়েছে কনটেইনারের জট।

তথ্যমতে, ডিসেম্বরে চট্টগ্রাম থেকে কমলাপুর আইসিডিতে ট্রেন গেছে ৩৭টি, সমানসংখ্যক ট্রেন আইসিডি থেকে খালি ও মজুদ পণ্যের কনটেইনার নিয়ে চট্টগ্রামে এসেছে। এছাড়া জ্বালানি নিয়ে সিলেট ও রংপুরে একটি করে ট্রেন চলাচলের পাশাপাশি শ্রীমঙ্গলে দুটি এবং ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে গেছে তিনটি ট্রেন। গত ১৯ থেকে ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১১ দিন পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় চট্টগ্রাম বন্দরে লায়িং কনটেইনারের সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৪৯৪টি। এছাড়া সিজিপিওয়াই ইয়ার্ডে লোডিং অবস্থায় কনটেইনার জমেছে ৩২৬টি। কনটেইনারবাহী কয়েকটি ট্রেন লোডিং অবস্থায় থাকলেও পরিবহন বিভাগের আপত্তি উপেক্ষা করে ইঞ্জিন সরিয়ে নেয়ায় ট্রেনগুলো বসিয়ে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে রেলওয়েসংশ্লিষ্টরা।

রেলের বাণিজ্যিক ও মার্কেটিং বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের সবচেয়ে জনপ্রিয় সুবর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেন থেকে রেলওয়ে আয় করেছে ৩৩ কোটি ৩৬ লাখ ২৫ হাজার ৮২২ টাকা। উভয়মুখে চলাচল ধরে সাপ্তাহিক বন্ধের দিন বাদে এ হিসাব করা হয়েছে। এ হিসাবে ট্রেনটি প্রতিদিন উভয়মুখে আয় করেছে গড়ে ১০ লাখ ৬৫ হাজার ৮৯৭ টাকা। যদিও ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের একটি কনটেইনারবাহী ট্রেন প্রতিটি উভয়মুখী ট্রিপে আয় করে ২০ লাখ টাকারও বেশি।

রেলওয়েসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুবর্ণ কিংবা সোনার বাংলা এক্সপ্রেস—একজোড়া ট্রেন থেকে প্রতিদিন ১০ লাখ টাকার বেশি রাজস্ব আয় হলেও পরিচালন খরচ অনেক বেশি। প্রতিটি বগিতে স্টুয়ার্ড, টিকিট বিক্রি ও ব্যবস্থাপনা খরচ মিলিয়ে রেলের নিট লাভের হার অনেক কম। কিন্তু পণ্য বা কনটেইনারবাহী একটি ট্রেনের ক্ষেত্রে পরিচালন ব্যয় খুবই সামান্য। তবুও রেলের অন্যান্য ট্রেনকে প্রাধান্য দিয়ে স্বল্প জনবল দিয়ে তুলনামূলক কম মানসম্পন্ন লোকোমোটিভে এসব ট্রেন পরিচালনা হয়। প্রায় দ্বিগুণ আয়ের পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় কম হওয়ায় পণ্যবাহী ট্রেন থেকে সবচেয়ে বেশি লাভ করলেও এ খাতে লোকোমোটিভ সরবরাহ দিয়ে ট্রেন পরিচালনা করতে অনীহা দেখাচ্ছে রেলওয়ে, যা রেলের আয় বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি দেশের আমদানি-রফতানি অর্থনীতিতে সংকট তৈরি করছে বলে মনে করছেন তারা।

চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩২ লাখ ৯৬ হাজার টিইইউ (টোয়েন্টি ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট) কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে চট্টগ্রাম বন্দর। ২০২৫ সালে কনটেইনার হ্যান্ডলিং ৩৪ লাখ টিইইউ ছাড়িয়ে গেছে। এক সময় ১০ শতাংশের মতো কনটেইনার রেলপথে পরিবহন হলেও ধারাবাহিকভাবে রেলের হিস্যা কমে আসছে। কিছুদিন আগেও গড়ে ৪-৫ শতাংশ কনটেইনার রেলপথে পরিবহন হতো। বর্তমানে সেটি ৩ শতাংশের নিচে নেমে গেছে।

আমদানি-রফতানি পণ্যবাহী কনটেইনার রেলপথে সাশ্রয়ী ভাড়া ও নিরাপদে পরিবহনের সুযোগ থাকায় চাহিদা থাকলেও রেলের অদূরদর্শিতা ও সমন্বয়ের অভাবে আস্থা হারাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তাছাড়া দুর্যোগ ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সময়ে এবং যানজটের কারণে সড়কের পরিবর্তে রেলপথে খাদ্যশস্য, জ্বালানি ইত্যাদি পরিবহন নিরাপদ হলেও সংস্থাটির অপারগতায় বাধ্য হয়ে সড়ক ও নৌপথকেই বেছে নিচ্ছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুবক্তগীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রেলওয়ে যাত্রীর পাশাপাশি পণ্য পরিবহনকেও সমান গুরুত্ব দেয়। দীর্ঘদিন ধরে লোকোমোটিভ সংকটের কারণে আমরা ট্রেন পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছি। ডিসেম্বরে স্পেশাল ট্রেন পরিচালনাসহ যাত্রীবাহী ট্রেনগুলোর স্বাভাবিক যাত্রা নিশ্চিত করতে পণ্যবাহী ট্রেন সার্ভিসে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটেছে। চট্টগ্রাম বন্দর ও ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা মাসের শেষ দিকে পণ্যবাহী ট্রেন সার্ভিস শুরু করেছি। এখন নিয়মিত কনটেইনার, জ্বালানি ও গুডস ট্রেনের সার্ভিস বাড়িয়ে দেয়ায় পণ্যবাহী ট্রেন নিয়ে সাময়িক জটিলতা দ্রুত নিরসন হবে।’

জানা গেছে, প্রতিদিন পণ্যবাহী ট্রেনের জন্য রেলের লোকোমোটিভ বরাদ্দ দেয়ার কথা ১৯টি। সংকটের কারণে বরাদ্দ দেয়া হয় ছয়-সাতটি। গত নভেম্বরে দৈনিক গড়ে ৩ দশমিক ২টি করে ইঞ্জিন সরবরাহ করা হয়েছে। সবশেষ ডিসেম্বরে ইঞ্জিন সরবরাহের হার কমে দৈনিক ২ দশমিক ৫টিতে নেমে গেছে। মূলত মাসের শেষার্ধে টানা ১১ দিন কোনো ট্রেন চলাচল না করায় পণ্যবাহী সার্ভিসে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। যদিও বন্দরে কনটেইনারের অপেক্ষমাণ তালিকা নভেম্বর থেকে প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের চাপে ৩০ ডিসেম্বর থেকে বাধ্য হয়ে রেলওয়ে পণ্য খাতে লোকোমোটিভ দেয়া শুরু করে। যার কারণে ৩০ ডিসেম্বর তিনটি ও ৩১ ডিসেম্বর দুটি পণ্যবাহী ট্রেন চালানোর সুযোগ পায় পরিবহন বিভাগ।

নাম প্রকাশ না করে রেলের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের শিল্প অর্থনীতি বিকাশের কারণে রেলপথে পণ্য পরিবহনের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যাত্রীবাহী ট্রেনে ভর্তুকি দিলেও পণ্যবাহী ট্রেনে লাভ করে গোটা রেল খাতকে লাভের ধারায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশেও শুধু পণ্যবাহী ট্রেন খাতে মনোযোগ দিলেই রেলওয়ে লাভজনক পর্যায়ে পৌঁছে যাবে। কিন্তু নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে এ বিষয়ে উদাসীনতার কারণে যাত্রী বা পণ্য পরিবহন—কোনো খাতেই ভালো করতে পারছে না সংস্থাটি।’

পরিবহনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা আইসিডিগামী ট্রেনগুলো পণ্যবাহী কিংবা পণ্যহীন কনটেইনার পরিবহন করলেই ভাড়া পাওয়া যায়। অর্থাৎ ভর্তি কনটেইনার নিয়ে কোনো ট্রেন বন্দর থেকে ঢাকা আইসিডিতে গেলে গ্রাহকের কাছ থেকে ভাড়া আদায় হয়, আবার একই কনটেইনার খালি অবস্থায় বন্দরে নিয়ে আসার জন্যও একই ভাড়া আদায় হয়। যার কারণে রেলওয়ে প্রতিটি উভয়মুখী ট্রেনে প্রায় ২০ লাখ টাকার বেশি আয় করে। একইভাবে শস্য, সার, জ্বালানিবাহী ট্রেনগুলো থেকেও যেকোনো যাত্রীবাহী ট্রেনের তুলনায় দ্বিগুণ আয় করে রেলওয়ে। কিন্তু গত এক বছরে ধারাবাহিকভাবে পণ্যবাহী ট্রেন সংখ্যা ক্রমেই কমছে।

আরও